রোজার ফজিলত ও রমজানের রোজার নিয়ত | রোজা ভঙ্গের কারণ সহ বিস্তারিত

You are currently viewing রোজার ফজিলত ও রমজানের রোজার নিয়ত | রোজা ভঙ্গের কারণ সহ বিস্তারিত

রোজার ফজিলত ও রমজানের রোজার নিয়ত কিভাবে করবেন বিস্তারিত জেনে নিনঃ ইসলামি বর্ষপুঞ্জির নবম মাস হলো রমজান। আরবি মাসের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। রামজান মাস মুসলমানদের কাছে খুব প্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। রমজান মাসেই পবিত্র কুরআনুল কারিম অবতীর্ণ হয়। তাছাড়া মুসলিমরা এ মাসে রোজা রাখে অর্থাৎ সিয়াম সাধনা করে থাকে। রমজান মাসের সাথে রোজা ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। রোজা বা সওম হলো ইসলামের মৌলিক পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে চতুর্থ। রামজান নামটি আল-কোরআনের দুই নম্বর সূরা আল বাকারার একশত পঁচাশি নম্বর আয়াতে মাত্র একবার এসেছে।

রমজানের সময়সূচি দেখতে ভিজিট করুন: রোজার সময়সূচি ২০২২

রমজান অর্থ কি?

রমজান একটি আরবি মাসের নাম। রমহান শব্দটি আরবি। আরবি রমজান শব্দটির মূল ধাতু হলো “রামাজা” । অর্থ

  • দহন।
  • জ্বলন।
  • ছাই-ভস্মে পরিণত হওয়া।

কেননা রোজা রাখায় ক্ষুধা-পিপাসার তীব্র জ্বালায় রেজাদারের উদর জ্বলতে থাকে। এই দহন ও কষ্টকে বোঝাবার জন্য আরবি ভাষায় বলা হয়ে থাকে যে রোজাদার দগ্ধ হয়, ভস্মীভূত হয়। ক্ষুধা-পিপাসার কী জ্বালা তা রোজাদার মর্মে মর্মে অনুভব করে বলেই রোজার মাসটির নাম রমজান রাখা হয়েছে।

রোজার নিয়ত

রোজা অর্থ কি?

রোজা ফার্সি শব্দ। সাওমকে ফার্সিতে রোজা বলা হয়। রোজা অর্থ – রমজান মাসে মুসলমান দিগের সূর্যের উদয়াস্ত উপবাস।

সওম অর্থ??

সাওম বলে রোজাকে। সওম মূলত আরবি শব্দ। কুরআন হাদিসের পরিভাষায় রমজান মাসে যে ৩০ টি রোজা রাখা হয় তাকে সওম বলা হয়েছে। যাকে সিয়ামও বলা হয়। সওম শব্দের অর্থ – বিরত থাকা। কিসে থেকে বিরত থাকবেন? নির্দিষ্ট সম পানহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকাকে সওম বলে।

রামজানকে রমজান বলার কারণ?

রমজান মাসকে রমজান নামকরণের কারণ হলো – এই মাসে রোজাদারগণ যে সকল নেক আমল করে; তা তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার ও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাদিস থেকে এরুপ জানা যায়।

রোজা বা সওমের ইতিহাস।

মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই রোজা বা সওম চলে আসছে। আদম ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ. কে জান্নাতে বসবাস করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দেন। নির্দিষ্ট একটি গাছের ফল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খেতে নিষেধ করা হয়েছিল, এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা।

রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, নূহ আলাইহিস সালাম ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। সেসময় রোজা রাখা আমাদের সময়ের মতো ছিল না।

ঈসা আ. তার নবুয়ত প্রাপ্তির আগে ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। তিনি কাফফারার দিনেরও রোজা রেখেছিলেন। খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা বনি ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত তারা আজও কাফফারার দিনের রোজা রাখেন।

ইসহাক আ. এর পুত্র নবী ইয়াকুব আ. কে ইসরাইল বলা হতো। তার বংশধরদেরকেই বনি ইসরাইল বলা হয়। এ সময় রোজার দু’টি ধরন পরিলক্ষিত হয়।

হযরত দউদ আ. একদিন রোজা রাখতেন একদিন ইফতার করতেন। তিনি এভাবে সারাবছর রোজা রাখতেন।

ইসলাম-পূর্ব জাহেলী যুগে, বিভিন্ন উপলক্ষে রোজা রাখা হতো। রাসূল সা. মদিনায় আশুরার রোজা নিয়ে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরকে রোজা রাখতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, তারা আশুরার রোজার কথা বলে। রাসূল সা. তাদের অনুসরণ যাতে না হয় এবং তাদের চেয়ে একটু ভিন্ন হয়, সেজন্য আশুরা এবং তার আগের দিন অথবা তার পরের দিন, কমপক্ষে দু’দিন দু’দিন করে মুসলমানদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন।

রমজানের আমল।

রমজানের আমল হলো। ইফতার। সাহরি। তারাবির নামাজ।  যিকির আযকার।

রমজানের ফজিলত ও গুরুত্ব।

রোজার অনেক ফজিলত রয়েছে। আমরা নিচে কিছু ফজিলত কুরআন ও হাদিসের আলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

  • রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: আল্লাহ্ তাআলা বলেন: রোজা আমারই জন্য। আমি নিজে এর প্রতিদান দেব। আমার বান্দা আমার জন্য পানাহার ছেড়ে দেয়, কামনা-বাসনা ছেড়ে দেয়। রোজাদারের জন্য দু’টি খুশি। একটি খুশি ইফতারের সময়। আরেকটি খুশি আমার সঙ্গে তার সাক্ষাতের সময়। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট  মিশকের সুগন্ধের চেয়েও উত্তম। (বুখারি : ৭৪৯২)
  • রোজা জাহান্নাম থেকে বাঁচার একটি ঢাল। যেমন – তোমাদের কাছে আছে হত্যা থেকে বাঁচার ঢাল। উত্তম রোজা হচ্ছে প্রত্যেক মাসের তিনটি রোজা। (সহিহ ইবনে খুযাইমা : ২১২৫)
  • আবু উমামা বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিন যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করব। তিনি বললেন: ‘তোমার জন্য অপরিহার্য হলো রোজা রাখা। কেননা এর কোনো তুলনা নেই’।

সুতরাং মেহমানের আগমন ব্যতীত আবু উমামার বাড়ি থেকে দিনের বেলা কখনো ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত না। তার বাড়ি থেকে দিনের বেলা ধোঁয়া উঠতে দেখলেই মানুষ বুঝত, আজ তার বাড়িতে মেহমান আছে। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৩৪২৫)

  • যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন রোজা রাখবে আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মাঝে একটি পরিখা তৈরি করে দেন। যা আকাশ ও জমিনের দূরত্বের মতো। (তিরমিজি : ১৬২৪)

জান্নাতে একটি ফটক আছে। তার নাম রাইয়্যান। কেয়ামতের দিন রোজাদারগণ সেই ফটক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অন্য কেউ সেই ফটক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে: রোজাদারগণ কোথায়? তখন তারা উঠবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ যাবে না। যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন রাইয়্যান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হবে। সুতরাং আর কেউ এ ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি : ১৮৯৬)

  • আমার উম্মতকে রমজান মাসে পাঁচটি জিনিস দান করা হয়েছে, যা আমার আগে কোনো নবীকেই দান করা হয়নি। প্রথম, রমজান মাসের প্রথম রাত যখন আসে তখন আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। আর যার উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে তাকে তিনি কখনো শাস্তি দেবেন না।

রমজানের পূর্বের দোয়া।

রাসুলুল্লাহ সা. রমজানের পূর্বে রজব ও শাবান মাসে এই দোয়া বেশি বেশি পড়তেন।
اَللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِىْ رَجَبَ وَ شَعْبَانَ وَ بَلِّغْنَا رَمَضَانَউচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা বারাকলানা ফি রাজাবা ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদেরকে রমজান মাস পর্যন্ত হায়াত দিন পৌঁছে দিন।’

সেহরি শব্দের অর্থ :

সেহরি আরবি শব্দ যার অর্থ জাদু। সেহরি বলতে আমরা যা বুঝায় তার সঠিক আরবি হলো সাহরি। সাহরি শব্দটি অর্থ বক্ষ, রাতের শেষ অংশ।

সেহরির দোয়া

 

রোজার নিয়ত।

রোজা রাখার নিয়ত হলো সকল কাজের মূল। রোজারও নিয়ত আছে। রোজার নিয়ত হলো।

نويت ان اصوم غدا من شهر رمضان المبارك فرضا لك ياالله فتقبل منى انك انت السميع العليم

বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা, ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।

বাংলা অর্থ:

হে আল্লাহ! আগামীকাল পবিত্র রমযান মাসে তোমার পক্ষ হতে ফরয করা রোজা রাখার নিয়ত করলাম, অতএব তুমি আমার পক্ষ হতে কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।

ইফতারের দোয়া।

ইফতারের সময়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। ইফতারের দোয়া হলো
اللهم لك صمت و على رزقك افطرت.

বাংলা উচ্চারণ :
(আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।)
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেয়া রিযিক দ্বারা ইফতার করছি।

 

রমজানের রহমত,বরকত ও মাগফিরাত

এখন আলোচনা করব রমজান মাসের ৩০দিনের তাৎপর্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে।  রমজানকে রাসুলুল্লাহ স. তিন ভাগে ভাগ করেন। যেমন-

রহমতে দশ দিন

রমজানের প্রথম ১০ দিন হল রহমতের অংশ। এই দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্য তার রহমতের দরজা খুলে দেন। যারা আল্লাহর কাছে ইবাদতের মাধ্যমে শোকর গুজার করে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য অবারিত রহমত বর্ষণ করেন।

মাগফিরাতের দশ দিন।

রমজানের ২য় ১০দিন হল মাগফিরাতের অংশ। এই দিন গুলাতে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের গুনাহ মাফ করেন।

নাজাতের দশ দিন।

রমজানের শেষ ১০ দিন হল নাজাতের অংশ। আল্লাহ তাআলা এই দিন গুলতে তা্র বান্দাদের জাহান্নাম হতে মুক্তি দান করেন।

রোজা ভঙের কারণ সমুহ।

রোজা ভঙ্গের কারণঃ রোজা ভঙ্গের অনেক করণ রয়েছে। আমরা নিচে রোজা ভঙ্গের কয়েকটি কারণ উল্লেখ করছি,

  • ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে রোজা ভেঙে যায়।
  •  স্ত্রী সহবাস করা রোজা ভঙ্গের কারণ।
  • কুলি করার সময় হলকের নিচে পানি চলে গেলে (অবশ্য রোজার কথা স্মরণ না থাকলে রোজা ভাঙবে না)।
  • ইচ্ছকৃত মুখভরে বমি করলে।
  •   নাকে বা কানে ওষুধ বা তেল প্রবেশ করানো রোজা ভঙ্গের কারণ।
  •  জবরদস্তি করে কেউ রোজা ভাঙালে।
  •  ইনজেকশান বা স্যালাইনের মাধ্যমে দেহে ওষুধ পৌঁছালে।
  •  কংকর, পাথর বা ফলের বিচি গিলে ফেললে।
  • সূর্যাস্ত হয়েছে মনে করে ইফতার করার পর দেখা গেল সূর্যাস্ত হয়নি।
  • পুরা রমজান মাস রোজার নিয়ত না করলে।
  • দাঁত থেকে ছোলা পরিমান খাদ্যদ্রব্য গিলে ফেললে।
  •  ধূমপান করা, ইচ্ছাকৃত লোবান বা আগরবাতি জ্বালিয়ে ধোঁয়া গ্রহণ করলে।
  • মুখ ভর্তি বমি গিলে ফেললে।
  • রাত আছে মনে করে সুবহে সাদিকের পর পানাহার করলে।
  • মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে পড়ে সুবহে সাদিকের পর জাগরিত হলে।

রোজার মাকরুহসমুহ।

  •  অনাবশ্যক কোনো জিনিস চিবানো বা চাখা।
  • কোনো দ্রব্য মুখে দিয়ে রাখা।
  • গড়গড়া করা বা নাকের ভেতর পানি টেনে নেয়া।
  • কিন্তু পানি যদি নাক দিয়ে গলায় পৌঁছে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে।
  •  ইচ্ছাকৃত মুখে থুথু জমা করে গিলে খেলে।
  • গীবত, গালা-গালি ও ঝগড়া-ফাসাদ করা।
  • কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া-ফাসাদ করতে এলে বলবে, আমি রোজাদার তোমাকে প্রত্যুত্তর দিতে অক্ষম।
  • সাড়া দিন নাপাক অবস্থায় থাকা।
  • অস্থিরতা ও কাতরতা প্রকাশ করা।
  •  পাউডার, পেস্ট ও মাজন ইত্যাদি দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা।

তারাবির নামাজ।

রামজানের সাথে তারাবির নামাজ সম্পৃক্ত।  তারাবির নামাজ এশার নামাজ পরে আদায় করা হয়।

তারাবি অর্থ।

তারাবি আরবি শব্দ।  তারবি শব্দের অর্থ প্রশান্তি, বিশ্রাম নেওয়া।

তারবির রাকাত সংখ্যা।

তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়ে তুমুল যুদ্ধ রয়েছে। কারো মতে তারাবির নামাজ ৮ রাকাত।  কারো মতে বিশ রাকাত। উভয় দলই হাদিস দিয়ে দলিল দেন। তাবে বিশ রাকাত তারাবির নামাজ এটাই বিশুদ্ধ।

লাইলাতুল কদর বা শবে বরাত।

লাইলাতুল কদর বা শবে বরাত রমজান মাসের সাথে সম্পূক্ত। শবে কদরে আল্লাহ কুরআন মাজিদ নাজিল করেন। লাইলাতুল কদরের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। পবিত্র কুরআনের মতে,  লাইলাতুল কদর হাজার বছরের চেয়ে উত্তম।

শবে কদর বা লাইলাতুল কদরের আমল।

শবে কদরে বেশি বেশি নেক কাজ বা আমল করা উচিত। বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করা, বেশি বেশি নফল নামাজ পরা, নিজের অতীতের গুনাহের মাফের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া।

Leave a Reply