শবে বরাতের ফজিলত, শবে বরাত এর রোজা, নামাজ ও অন্যান্য আমল

শবে বরাতের ফজিলত: ইসলামে কয়েকটি রাত খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ রাত গুলোতে ইবাদত করা অন্যান্য রাতে ইবাদত করার তুলনায় বহুগুণ সাওয়াব ও ফজিলতপূর্ণ। তারমধ্যে লাইলাতু নিসফু মিন শাবান বা শবে বরাত অন্যতম। শবে বরাত কি? শবে বরাতের ফজিলত কি? এসব বিষয় অনেকে জানতেন চান। আমরা আজ শবে বরাতের ফজিলত ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

শবে বরাত এর পরিচয়।

শবে বরাত আমাদের কাছে এতো বেশী পরিচিত যে আমরা ধরে নিয়েছি এটা বাংলা ভাষার শব্দ হয়ত হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তা নয়। শবে বরাত শব্দটি বাংলা নয়। বরং ফারসি। আবাক হলেন? আসলে শবে বরাত ফর্সি শব্দ।

শবে বরাত এর অর্থ কি।

শবে বরাত মুসলমানদের কাছে লাইলাতুল বরাত নামে পরিচিত। শব অর্থ রাত।আর বরাত অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। শবে বরাত অর্থ নাজাতের রাত বা মুক্তির রাত।

শবে বরাত কখন??

আরবি মাসের অন্যতম মাস হলো শাবান। হাদিস শরিফে নিসফে শাবান বা শাবান মাসের অর্ধেক বুঝানো হয়েছে। আরবিতে যেহেতু রাত প্রথমে আসে তাই ১৪ তারিখ রাত হলো শবে বারাত।

শবে বরাতের নামাজ ও আমল।

শবে বারাতের নির্দিষ্ট কোন ইবাদত নেই। এইদিন অন্যান্য দিনের মতন ইবাদত করতে হয়। কোন নির্দিষ্ট নামাজ নেই।

  • তবে বেশি বেশি দুই রাকাত করে নফল নামাজ পড়ুন।
  • তাহাজ্জুদ পড়ুন।
  • কাযা হওয়া নামাজ পড়তে পারেন।

কিন্তু এ রাতের ফজিলত একটু বেশি। তাছাড়া কিছু আমল এদিন করা হয়, তা আমরা আপনার সুবিধার্তে তুলে ধরলাম

  • অনেকেই নফল নামাজ,
  • কোরআন তেলওয়াত করে থাকেন।
  • দোয়া করে থাকেন।
  • অনেকেই এ রাতে বাবা-মা সহ আত্মীয়দের কবর জিয়ারত ও দোয়া করেন।
  • পরদিন রোজা রাখেন।

শবে বরাতের নামাজের নিয়ম।

আমরা আগেই বলেছি শবে বরাতের নির্দিষ্ট নামাজ নেই। তবে আপনি এ রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ পরতে পারেন। নিচে আমরা শবে বরাতে কিভাবে নফল নামাজ আদায় করবেন তা তুলে ধরছি।

  • প্রথমে আপনি দুই রাকাত নফল নামাজের নিয়ত করবেন।
  • বাংলায় নিয়ত করলেই চলবে।
  • সানা পড়ে সুরা ফাতেহা পড়বেন।
  • যেকোনো সুরা মেলাবেন ।
  • পড়ার পর রুকু করবেন।
  • সিজদা করবেন।
  • তারপর প্রথম রাকাতের মতন সুরা ফাতিহা পড়বেন।
  • সুরা মিলিয়ে রুকু সিজদা করবেন।
  • তারপর বৈঠক করবেন।
  • তাশাহ্হুদ, দুরুদ ও দোয়ায়ে মাছুরা পড়বেন।
  • সালাম ফিরাবেন।

এভাবে শবে বরাতের নফল নামাজ পড়তে পারেন।

 

শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে আলেমদের কিছু উক্তি।

শায়েখ ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, ‘পনেরো শাবানের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক ‘মারফু’ হাদীস ও ‘আসারুস সাহাবা’ বর্ণিত রয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফজিলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালাফে সালেহীনের কেউ কেউ এ রাতের নফল নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হতেন। আর শাবানের রোযার ব্যাপারে তো সহীহ হাদীসসমূহই রয়েছে।

হাম্বলি ও অধিকাংশ আলেমই এই রাতের ফজিলতের কথা স্বীকার করে থাকেন। ইমাম আহমাদ রাহ.-এর একই মত পোষন করেন।

ইমাম যাইনুদ্দীন ইবনে রজব দামেস্কী এর মতে,
শাবান মাসের পনেরো তারিখে রোযা নিষেধ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কেননা ওই দিন তো ‘আইয়ামে বীজ’ (চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর প্রতি মাসেই আইয়ামে বীজ-এ রোযা রাখা মুস্তাহাব।

ইমাম ইবনুল হাজ্জ র. বলেন
“এ রাত যদিও শবে কদরের মত নয়; কিন্তু এর অনেক ফযীলত ও বরকত রয়েছে।

শবে বরাতের রাতের বিদায়াত।

আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবি বলেন,
ঘর-বাড়ি, দোকান-পাটে আলোকসজ্জা করা, খেলাধুলা ও আতশবাজির উদ্দেশ্যে সমবেত হওয়া ইত্যাদি। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এগুলোর সপক্ষে কোনো জাল রেওয়ায়েতও কোথাও নেই। প্রবল ধারণা যে, এগুলো হিন্দুদের ‘দেওয়ালী’ প্রথা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।

হাদিসের আলোকে শবে বরাতের ফজিলত।

হাদিসে শবে বরাতের অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শা’বানের রাতে (শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান)

হযরত আ’লা ইবনুল হারিছ রাহ. থেকে বর্ণিত, উম্মুল মু’মিনিন হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) রাতে নামাজে দাঁড়ালেন এবং এতো দীর্ঘ সিজদা করলেন যে – আমার আশঙ্কা হলো, তাঁর হয়তো ইন্তেকাল হয়ে গেছে। আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে আয়েশা!তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে – আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন?
আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না। নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি তখন বললেন, এটা হলো অর্ধ শা’বানের রাত। আল্লাহ তাআলা অর্ধ শা’বানের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি প্রদান করেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী)

আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, পনেরো শা’বানের রাত যখন আসে তখন তোমরা তা ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং পরদিন রোজা রাখ। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

শবে বরাতের রোজা কয়টি?

শবে বরাতে রোজা কয়টি অনেকে জানতে চান। হাদিসের আলোকে বলা যায় শবে বারাতের একটি রোজা রাখা যায়।
আর ১৫ তারিখ যেহেতু আইয়্যামে বিজ তাই রোজা রাখলে আইয়্যামে বিজের নফল রোজাও রাখা হয়ে যাবে। আইয়্যামে বিজ হলো প্রত্যেক মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ।

শবে বরাতের রোজার নিয়ত।

শবে বরাতের রোজার নিয়ত হলো, “আমি আজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখার নিয়ত করছি”।

শবে বরাত ২০২২ সালে কবে?

শাবান মাসের ১৫ , ইংরেজি তারিখ অনুযায়ী ১৮ মার্চ দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

 

 

 

Leave a Comment